পবিত্র কুরআনের দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে বড় সূরা হলো সূরা বাকারা। এই সূরার প্রতিটি আয়াতের রয়েছে বিশেষ গুরুত্ব ও তাৎপর্য। তবে এর মধ্যে সূরা বাকারার শেষ আয়াতগুলোর (বিশেষ করে শেষ দুই ও তিন আয়াত) ফজিলত ও মর্যাদা অপরিসীম।
রাসুলুল্লাহ (সা.) এই আয়াতগুলোর বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও আমলের ব্যাপারে উম্মতকে তাগিদ দিয়েছেন।
সূরা বাকারার শেষ তিন আয়াত
সাধারণত সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত (২৮৫ ও ২৮৬ নম্বর আয়াত) সবচেয়ে বেশি আলোচিত এবং এর ফজিলত প্রমাণিত। তবে অনেকে ২৮৪ নম্বর আয়াতসহ সূরা বাকারার শেষ তিন আয়াত একসাথে তিলাওয়াত করেন।
২৮৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহর সর্বময় ক্ষমতা ও মানুষের অন্তরের খবরা খবর রাখার কথা বলা হয়েছে, আর পরবর্তী দুটি আয়াতে মুমিনদের ইমান, আত্মসমর্পণ এবং আল্লাহর কাছে বিশেষ দোয়ার বিবরণ রয়েছে।
সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত বাংলা অর্থসহ
সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত (২৮৫-২৮৬) নিচে উচ্চারণ এবং বাংলা অর্থসহ দেওয়া হলো:
আয়াত ২৮৫:
উচ্চারণ: আমানার রাসূলু বিমা উনযিলা ইলাইহি মির রব্বিহী ওয়াল মু’মিনূন। কুল্লুন আমানা বিল্লাহি ওয়া মালাইকাতিহী ওয়া কুতুবিহী ওয়া রুসুলিহী, লা নুফাররিকু বাইনা আহাদিম মির রুসুলিহী। ওয়া কালূ সামি’না ওয়া আত্বা’না গুফরানাকা রব্বানা ওয়া ইলাইকাল মাছীর।
অর্থ: রাসুল তাঁর প্রতি তাঁর রবের পক্ষ থেকে যা অবতীর্ণ হয়েছে তার ওপর ইমান এনেছেন এবং মুমিনগণও। প্রত্যেকেই ইমান এনেছে আল্লাহর ওপর, তাঁর ফেরেশতাকুল, তাঁর কিতাবসমূহ এবং তাঁর রাসুলগণের ওপর। (তারা বলে) ‘আমরা তাঁর রাসুলদের মধ্যকার কারও মধ্যে কোনো তারতম্য করি না।’ আর তারা বলে, ‘আমরা শুনলাম এবং আনুগত্য করলাম। হে আমাদের রব! আমরা আপনার ক্ষমা প্রার্থনা করি, আর আপনার দিকেই প্রত্যাবর্তনস্থল।’
আয়াত ২৮৬:
উচ্চারণ: লা ইউকাল্লিফুল্লাহু নাফসান ইল্লা উস’আহা, লাহা মা কাসাবাত ওয়া ‘আলাইহা মাকতাসাবাত। রব্বানা লা তুআখিজনা ইন নাসীনা আও আখত্বা’না। রব্বানা ওয়া লা তাহমিল ‘আলাইনা ইছরান কামা হামালতাহু ‘আলাল্লাযীনা মিন ক্বাবলিনা। রব্বানা ওয়া লা তুহাম্মিলনা মা লা ত্বাক্বাতা লানা বিহী, ওয়া’ফু ‘আন্না ওয়াগফির লানা ওয়ারহামনা, আনতা মাওলানা ফানছুরনা ‘আলাল ক্বাওমিল কাফিরীন।
অর্থ: আল্লাহ কোনো মানুষের ওপর তার সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়ে দেন না। সে যা ভালো উপার্জন করেছে তা তারই জন্য এবং সে যা মন্দ কামাই করেছে তা তারই ওপর বর্তাবে। (হে মুমিনগণ, তোমরা বলো) ‘হে আমাদের রব! যদি আমরা ভুলে যাই কিংবা ভুল করি, তবে আমাদের পাকড়াও করবেন না। হে আমাদের রব! আমাদের ওপর এমন গুরুভার চাপিয়ে দেবেন না, যেমন চাপিয়ে দিয়েছিলেন আমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর। হে আমাদের রব! আমাদের ওপর এমন বোঝা চাপাবেন না, যা বহন করার শক্তি আমাদের নেই। আমাদের পাপ মোচন করুন, আমাদের ক্ষমা করুন এবং আমাদের প্রতি দয়া করুন। আপনিই আমাদের অভিভাবক। অতএব, কাফির সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদের সাহায্য করুন।’

সূরা বাকারার শেষ তিন আয়াত ফজিলত
ইসলামিক স্কলার এবং হাদিসের আলোকে সূরা বাকারার শেষ আয়াতগুলোর ফজিলত অনন্য। বিশেষ করে শেষ দুই আয়াতের ফজিলত সম্পর্কে বুখারি ও মুসলিম শরিফসহ বিভিন্ন হাদিস গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে:
- রাতের জন্য যথেষ্ট: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি রাতে সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত তিলাওয়াত করবে, তা তার জন্য যথেষ্ট হবে।“ (সহিহ বুখারি)। মুহাদ্দিসগণের মতে, ‘যথেষ্ট হওয়া’র অর্থ হলো—এটি তাকে রাতের যাবতীয় অনিষ্ট, জিন-শয়তানের ক্ষতি থেকে রক্ষা করবে অথবা তা ওই রাতের তাহাজ্জুদের স্থলাভিষিক্ত হবে।
- আরশের নিচের বিশেষ ভাণ্ডার: অন্য এক হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “আমাকে সূরা বাকারার শেষ আয়াতগুলো আরশের নিচের বিশেষ ভাণ্ডার থেকে দেওয়া হয়েছে, যা আমার পূর্বে কোনো নবীকে দেওয়া হয়নি।“ (মুসনাদে আহমদ)।
- দোয়া কবুলের মাধ্যম: এই আয়াতগুলোর শেষ অংশটি মূলত একটি গভীর ও আন্তরিক প্রার্থনা। বান্দা যখন এই আয়াতগুলো পড়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও সাহায্য চায়, আল্লাহ তাআলা তা কবুল করে নেন।
- ঘর শয়তান মুক্ত থাকে: রাসুল (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তাআলা পৃথিবী সৃষ্টির দুই হাজার বছর আগে একটি কিতাব লিখেছেন। তা থেকে দুটি আয়াত নাজিল করে সূরা বাকারা শেষ করেছেন। যে ঘরে তিন রাত এই আয়াত দুটি পড়া হবে, শয়তান তার কাছেও ঘেঁষতে পারবে না। (তিরমিজি)।
সূরা বাকারা-র শেষ আয়াতগুলো কেবল কুরআনের অংশই নয়, বরং এটি উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এক মহান উপহার। প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে এই আয়াতগুলো অর্থসহ বুঝে পড়ার অভ্যাস করা উচিত। এতে যেমন ইমান তাজা হয়, তেমনি দুনিয়া ও আখিরাতের যাবতীয় অনিষ্ট থেকে আল্লাহর আশ্রয় লাভ করা যায়।
