মহররম মাসের ফজিলতঃ
সৃষ্টির শুরু থেকে পৃথিবীতে মহান আল্লাহ যে ১২ মাস নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন, তার মধ্যে মর্যাদাসম্পন্ন মাস রয়েছে ৪ টি। জিলকদ, জিলহজ, মহররম ও রজব।
এর মধ্যে মহররম মাসের রয়েছে আলাদা তাৎপর্য। পৃথিবীর সর্বপ্রথম মানব থেকে শুরু করে ইসলামের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, বেশিরভাগই ঘটেছে এই মহররম মাসে। সেই ঘটনা গুলোর সম্মানার্থে, মহররম মাসকে সম্মানিত মাস বলা হয়।
মহররমের ১০ তারিখকে ধরা হয় অত্যন্ত ফজিলত পূর্ণ একটি দিন হিসেবে। এই দিনের রয়েছে এক তাৎপর্যপূর্ণ ইতিহাস।
১০ই মহররমের ইতিহাসঃ
১০ই মহররমকে আশুরা নামে ডাকা হয়। এদিনটিতে পৃথিবীর প্রথম মানবের সৃষ্টি, পৃথিবীতে আগমন ও ক্ষমার ঘটনা সংঘটিত হয়।
এদিনটিতেই হযরত ঈসা আঃ জন্মগ্রহণ করেন, এবং এই দিনেই তাকে দুনিয়ার জমিন থেকে আসমানে মহান আল্লাহর নির্দেশে উঠিয়ে নেওয়া হয়।
হযরত ইউনুস আঃ ৪০ দিন মাছের পেটে থাকার পর, এই দিনেই মহান আল্লাহর নির্দেশে মুক্তি পান।
এইদিনে দীর্ঘ এক যন্ত্রণা দায়ক রোগ থেকে মুক্তি পান হযরত আইয়ুব (আঃ)। এই দিনে হযরত ইয়াকুব (আঃ) তার হারানো পুত্র হযরত ইউসুফ (আঃ) ৪০ বছর পর খুঁজে পান।
এই দিনে হযরত ইব্রাহীম (আঃ) দীর্ঘ ৪০ দিন আগুনের কুন্ডুলির মধ্যে অবস্থানের পর, মহান আল্লাহর রহমতে নিরাপদে মুক্তি পান, এবং সহিহ সালামতে ফিরে আসেন। তাকে নমরুদ অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করেছিলো, মুর্তিপূজার বিরোধীতার কারণে। কিন্তু মহান আল্লাহ সেই অগ্নিকুন্ডকে শীতল করে দেন ইব্রাহিম (আঃ) এর জন্য।
এই দিনেই নিজের হারানো রাজত্ব ফিরে পান সুলায়মান (আঃ)।
এই দিনেই হযরত মূসা (আঃ) ফেরাউনের বিরুদ্ধে বিজয় লাভ করেন, এবং ফেরাউন ও তার দল নীলনদে তলিয়ে যায়।
এসহ, আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সংঘটিত হয়েছিলো এই আশুরার দিনেই।

মহররম মাসের ফজিলত ও আমল:
এই মাসের গুরুত্ব যেমন নবীদের জীবনীতে ছিলো, তেমনি এর গুরুত্ব ও ফজিলত রয়েছে মুসলমানের জন্যও।
এ মাসে বেশি বেশি ইসতেগফার ও জিকির করা উত্তম আমল। একইসাথে এই মাসে নফল ইবাদতে বেশি জোড় দেওয়া, এবং রোযা রাখা হয়। অধিক দান-সদকা, ও দরুদ পাঠ করা হয়।
এ মাসে মহান আল্লাহ এর পূর্বেও অনেক জাতিকে ক্ষমা করেছেন। রাসুল (সা.) বলেন, ‘এই মাসে এমন একটি দিন আছে, যাতে তিনি অতীতে একটি সম্প্রদায়কে ক্ষমা করেছেন এবং ভবিষ্যতেও অপরাপর সম্প্রদায়কে ক্ষমা করবেন।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৭৪১)
মহররম মাসের রোজা কয়টি?
এই মাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল, আশুরার রোযা। যা মহররম মাসের ১০ তারিখ রাখা হয়। অনেকেই জানেন না, আদতে কয়টি রোজা রাখা উচিত, বা কয়টি রোজা রাখতে হয়।
মহররমের রোযার বিষয়ে হাদিস শরিফে এসেছে,
“পবিত্র আশুরা উপলক্ষে দুটি রোজা রাখা সুন্নত। রোজা রাখার পদ্ধতি হলো মহররমের ৯ থেকে ১০ কিংবা ১০ থেকে ১১ তারিখ রোজা রাখা।” (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ২১৫৪)
অপর এক হাদিসে এসেছে,
রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমরা আশুরার দিন রোজা রাখো এবং তাতে ইহুদিদের বিরোধিতা করো, আশুরার আগে এক দিন বা পরে এক দিন রোজা রাখো।’ (সহিহ ইবনে খুজাইমা, হাদিস: ২০৯৫)
অর্থাৎ আশুরার রোযা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ এক আমল। এ রোযার বিষয়ে বেশ কয়েকটি হাদিস এসেছে। শুধু বড়রা নয়, ছোটদেরও রোযা রাখার বিষয়ে আদেশ দেওয়া হয়েছে।
রুবাইয়্যেই বিনতে মুআওয়েজ (রা.)-এর বর্ণনা থেকে পাওয়া যায়, রাসুল (সা.) আশুরার দিন সকালে আনসার সাহাবিগণের গ্রামগুলোতে দূত পাঠিয়ে ঘোষণা দিতে বলেন, ‘যে ব্যক্তি সকালে কিছু খেয়ে ফেলেছে সে যেন বাকি দিন না খেয়ে পূর্ণ করে। আর যে ব্যক্তি না খেয়ে আছে, সে যেন অবশ্যই রোজা রাখে।’ রুবাইয়্যেই বলেন, ‘এরপর আমরা নিজেরা রোজা রাখাতাম এবং আমাদের শিশুদেরও রোজা রাখতাম। তাদের তখন তুলা দিয়ে বানানো খেলনা দিতাম। কেউ খাবারের জন্য কাঁদলে তাকে ইফতারি পর্যন্ত খেলনা দিয়ে ব্যস্ত রাখতাম; যেন তারা রোজাটি পূর্ণ করতে পারে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯৬০; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৩৬)
রোযা রাখার পাশাপাশি এ দিনে অসহায়দের দান-সদকা, এবং ইফতার করালেও অধিক সওয়াব রয়েছে।

মহররমের ঘটনাঃ
মহররম মাসের অন্যতম এক হ্রদয় বিদারক ঘটনাটি হলো কারবালা যুদ্ধ। এ যুদ্ধে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর দৌহিত্র হোসাইন (রঃ) সহ আইলে বাইতের ২৩ জন সদস্য শাহাদাত বরণ করেন। হোসাইন রঃ এর শিশু সন্তানও সেই যুদ্ধে শহীদ হয়।
কারবালার এ ঘটনা মুসলিম ইতিহাসে ন্যায় ও সত্যের জন্য আত্মত্যাগের এক অমর প্রতীক। যা কখনো ভুলবার নয়। অনেকেই তাদের এ আত্মত্যাগকে স্মরণ করে মহান আল্লাহর নিকট বেশি বেশি দরুদ পাঠ করেন। এবং জিকির করেন।
এ মাসে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) মক্কা থেকে মদিনায় ঐতিহাসিক হিজরত করেন। দিনটিকে এ ঘটনার জন্যও সম্মানের সহিত স্মরণ করা হয়।
মহররম মাসে যেমন ঘটেছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, উত্থান-পতন, তেমনি এ মাস আমাদের জন্য শোকাবহ। মহান আল্লাহ এতো নিদর্শন রেখেছেন এই মাসে। এবং এই মাসকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন তাৎপর্যপূর্ণ ৪ টি মাসের একটিতে।
আমরা এর গুরুত্ব উপলব্ধি করবো। এ মাসে অধিক আমল করার চেষ্টা করবো। এবং ১০ই মহররমের রোযার নিয়ত করবো। নিজে রোযা থাকবো, অন্যকে রোযার বার্তা পৌছে দিবো। ইনশাআল্লাহ মহান আল্লাহ, এ ফজিলত পূর্ণ মাসের আমলে আমাদের উপর সন্তুষ্ট হবেন। এবং আমাদের মাফ করবেন।
লেখক: মির্জা শাহরিয়ার



