ঈদ-উল-আযহা আমাদের যা শিক্ষা দেয়ঃ মুসলমান হিসেবে, ঈদ সমূহ আমাদের আনন্দের উপলক্ষ। ছোট থেকে বড়, সবার জন্যই খুশির একটি দিন। তবে ঈদ শুধু আহার আর উৎসবের আমেজই বয়ে আনে না। এগুলো আমাদের জন্য এক লুকায়িত বার্তাও বটে।
ঈদ-উল-ফিতর এর পূর্বে আমরা দীর্ঘ এক মাস রোযা রাখি। রোযা আমাদের শেখায়, ধৈর্য ও সংযম। খারাপ থেকে দূরে থাকা, নজরের হেফাজত করা, অন্যায় ও জেনাহ থেকে বেঁচে থাকা।
ঠিক একই রূপে, কুরবানী ঈদও আমাদের জন্য উপদেশস্বরূপ।

কুরবানীর ইতিহাসঃ
আমরা সে ঘটনা সবাই জানি। মহান আল্লাহর আদেশে, হযরত ইব্রাহীম (আ) তার পুত্রকে কুরবানী করতে উদ্যত হয়েছিলেন। আল্লাহ তায়ালা নবী ইব্রাহিম (আ) এর খাঁটি ঈমান, ও তাকওয়ায় সন্তুষ্ট হয়ে জান্নাত থেকে এক দুম্বাকে সেই ছুরির নিচে প্রেরণ করলেন। দুম্বাটি কোরবানি হলো। সেই রীতি থেকেই আমরা এখন পশু জবেহ করে থাকি।
কিন্তু আজ, আমাদের সমাজে পশু কোরবান করাটাও যেন এক প্রদর্শনের বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কে কার থেকে অধিক দামে পশু ক্রয় করবে, কার কোরবানির পশু বিশাল আকারের, এ নিয়ে আমরা তর্কে লিপ্ত হই। ঋণ নিয়ে হলেও হাটের ভালো পশুটি ক্রয় করে আনি, অথচ ইসলামের বাকি স্তম্ভ গুলোর প্রতি আমরা যেন উদাসীন!
আমরা এমনটা কখনোই করবো না, যা দ্বারা মহান আল্লাহ আমাদের উপর নারাজ হন। বিশাল আকারের পশুতে বেশি নেকি নয়। নেকিতো নির্ধারিত হয়, বান্দার খাঁটি নিয়ত ও তাকওয়ায়!
কোরবানির ফজিলত – কোরবানির খাস দিল, এবং পরিচ্ছন্ন ইচ্ছা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব বহন করে। যথাযথ নিয়ম মেনে দেওয়া কোরবানি, হতে পারে আপনার নেকি লাভের উপায়।
হাদিসে এসেছে,
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সাহাবীগণ বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! এতে কি আমাদের জন্য সাওয়াব আছে? তিনি বললেন, কুরবানীর পশুর প্রত্যেকটি পশমের পরিবর্তে একটি করে প্রতিদান রয়েছে। সাহাবীগণ আবার জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রসূল! পশমওয়ালা পশুদের ব্যাপারে কী হবে? (এদের পশম তো অনেক বেশী)? তিনি বললেন, পশমওয়ালা পশুদের প্রতিটি পশমের পরিবর্তে একটি করে নেকি রয়েছে। (ইবনে মাজাহ ৩১২৭)
সুতরাং কোরবানির রক্ত মাংস কোনটিই মহান আল্লাহর নিকট না পৌঁছালেও, তিনি এর উত্তম প্রতিদান আমাদিগকে দিবেন, যদি আমাদের নিয়ত বিশুদ্ধ হয়। আমরা সচেষ্ট থাকবো, যাতে কোরবানির ঠিক আগ মূহুর্তে শয়তান আমাদিগকে গোমরাহ না করতে পারে।
নিশ্চয়ই শয়তানের চাল, বড়ই কঠিন!

কোরবানির নিয়মঃ
যার উপর কোরবানি ফরজ হয়েছে, তিনি নিজের কেনা পশু নিজেই জবেহ করবেন। তবে যদি তিনি এতে অক্ষম হন, অথবা সঙ্কিত থাকেন যে তিনি তা ভালোভাবে সম্পন্ন করতে পারবেন না, তবে অভিজ্ঞ কারো মাধ্যমেই জবেহ সম্পুর্ন করতে হবে। পশুকে যতটা সম্ভব কম কষ্ট দিয়ে জবেহ করতে হবে।
কোরবানির দোয়াঃ
পশুর গলায় ছুরি চালাবার মুহূর্তে পড়তে হবে “বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার, আল্লাহুম্মা মিনকা ওয়া লাকা।”
যদি কোনো ক্ষেত্রে সম্পুর্ন আয়াতটি মনে না আসে, তবে শুধুমাত্র “বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার” বলেও কোরবানি সম্পন্ন করা যাবে। তবে দোয়া ছাড়া কোরবানি করলে, তা কবুল না হওয়ার সঙ্কা থাকে। তাই জবেহ করার সময় অন্তত ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার‘ বলা আবশ্যক, অন্যথায় কোরবানি শুদ্ধ হবে না।
কোরবানি ও আকিকার দোয়া – শিশুর আকিকার সময় হয়ে এলে, আকিকা উপলক্ষ্যে যে পশু জবেহ করা হয়, তার পূর্বে এই দোয়াটা পড়া উত্তম
“বিসমিল্লাহি ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহুম্মা লাকা ওয়া ইলাইকা, হাযিহী আকীক্বাতু [শিশুর নাম]।”
(অর্থ: আল্লাহর নামে শুরু করছি এবং আল্লাহ মহান। হে আল্লাহ! এটি তোমারই জন্য এবং তোমারই উদ্দেশ্যে।
এটি অমুকের (শিশুর নাম) আকিকা।)
ছেলে শিশুর জন্য দুটি এবং মেয়ে শিশুর জন্য একটি পশু জবাই করা সুন্নাত। তবে সামর্থ্য কম থাকলে ছেলের পক্ষ থেকে একটি পশু জবাই করার ব্যাপারেও কোনো কোনো ফকিহ মত দিয়েছেন।
কোরবানির গোশত বন্টনের নিয়ম – কোরবানির গোশত তিন ভাগে বণ্টন করা মুস্তাহাব। তবে কোনো বিশেষ প্রয়োজনে বা পরিবারের সদস্য সংখ্যা বেশি হলে কেউ যদি কম-বেশি বণ্টন করেন, তাতে কোরবানির কোনো ক্ষতি হবে না। তবে সমাজের দরিদ্র ও প্রতিবেশীদের হক আদায় করাটাই ইসলামের অন্যতম সৌন্দর্য।
কোরবানি বিষয়ে পবিত্র কোরআন শরীফে এরশাদ হয়েছে,
“আল্লাহর নিকট এগুলোর গোশতও পৌঁছে না এবং রক্তও পৌঁছে না; বরং তাঁর নিকট পৌঁছে তোমাদের মনের তাকওয়া (আল্লাহভীতি)। এভাবে তিনি সেগুলোকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন, যাতে তোমরা আল্লাহর মহিমা ঘোষণা করতে পারো, এজন্য যে তিনি তোমাদের হেদায়েত দান করেছেন। সুতরাং আপনি সুসংবাদ দিন সৎকর্মশীলদেরকে।”(সূরা আল-হাজ্ব, আয়াত: ৩৭)
আয়াতে সুস্পষ্ট প্রতিয়মান, আমাদের মনের তাকওয়া এবং মনের ভীতিই একমাত্র তার নিকট পৌছায়। ভালো ও মন্দের মধ্যে, আল্লাহর ভয়ে মন্দটাকে কোরবান করাটাই আমাদের হেদায়েতের উছিলা।
যারা মহান আল্লাহর হেদায়েত প্রাপ্ত হয়, তাদেরকে তিনি দিয়েছেন জান্নাতের সুসংবাদ।
ধরুন, আপনাকে কেউ একটি বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলো। তখন আপনার নিকট দুটি পথ খোলা রইলো। হয় আপনি তাকে সত্যটি বলবেন। নয়তো নিজের সাময়িক সুবিধার জন্য মিথ্যে বলে তাকে আশ্বস্ত করবেন। ঠিক এই মুহুর্তেই আসে, কোরবানির মহত্ত্ব!
যদি আপনি মিথ্যাকে কোরবান করে সত্যকে বেছে নেন, আপনার আমলনামা বেঁচে যাবে একটি গোনাহ থেকে। লিখা হবে একটি সৎ কর্মের তদবির।
আপনার এই কোরবানির জন্য, হয়তো আপনি সাময়িক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন। হয়তো এর জন্য আপনাকে ইহকালে নিকৃষ্ট কিছুরও সাক্ষিও হতে হবে। কিন্তু পরকালে আপনি পাবেন, উত্তম পুরস্কার।
আপনি মিথ্যে কথাটা বলেননি। এক আল্লাহর ভয় রেখে, আপনি খারাপকে কোরবানি দিয়েছেন। আল্লাহর যদি চান, সফল ও ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত তিনি অবশ্যই আপনাকে করবেন।
এভাবেই আমাদের জীবনে প্রতি ক্ষেত্রে দুটো পথ খোলা থাকে। ভালো ও খারাপ। তন্মোধ্য, খারাপটিকে কোরবানি করাটা আমাদের বাঞ্ছনীয়। এভাবেই আমরা হবো সফলকাম। নিশ্চয়ই খারাপ কোনো কিছুর মধ্যে কখনোই কল্যাণ থাকতে পারে না? সে তো সাময়িক সুখ মাত্র!
পবিত্র কোরআন শরীফে এরশাদ হয়েছে,
“বলো, ‘আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মরণ—সবকিছুই বিশ্বজাহানের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য।’”(সূরা আল-আন’আম, আয়াত: ১৬২)
এক আল্লাহর জন্য, আমরা আমাদের সকল খারাপ অভ্যাস ও কাজ সমূহকে যদি বর্জন করি, তবে সে ফলাফল তো আমরা প্রকাশ্যেই দেখতে পাবো। এবং আল্লাহর দেওয়া এ ক্ষণস্থায়ী জীবনে সহিহ পথে চলার জন্য পরকালে পুরস্কৃত হবো।
কোরবানি তাই বারবার ফিরে আসে, প্রতিবছর এই রবের সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ত্যাগের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে।
সুসংবাদ দিতে তাদেরকে, যারা নিয়মিতভাবে নিজের আমলনামা বিশুদ্ধ রেখেছে।
আমরা সচেতন হই। আমাদের কথায়, কাজে, ব্যবহারে, আমরা ত্যাগ করি সকল খারাপ কিছুকে। পশু কোরবানিকে গুরুত্বের সাথে নিয়ে, তা পালনে হই সচেষ্ট। অন্তর রাখি বিশুদ্ধ। মনে রাখি মহান আল্লাহর ভয়। ইনশাআল্লাহ, এ জীবন আমাদের জান্নাতের বাগান হয়ে উঠবে।
দিনশেষে সফলকাম তো তারাই, যারা বুঝবে রবের রহমত!
লেখক – মির্জা শাহারিয়া
