অহংকারকে আরবীতে বলা হয় কিব্র (الْكِبْر)। যার অর্থ বড়ত্ব। অর্থাৎ অন্যের চাইতে নিজেকে বড় মনে করা। সত্যকে দম্ভভরে প্রত্যাখ্যান করা এবং মানুষকে তুচ্ছ জ্ঞান করা। অহংকার আখলাকে জামিমাহর অন্তর্ভুক্ত, অর্থাৎ এটি একটি নিন্দনীয় কাজ। যা চারিত্রিক গুণাবলীর সম্পুর্ন বিপরীত।
অহংকার নিয়ে কোরআনের আয়াত:
অহংকারি ব্যাক্তিকে আল্লাহ তায়ালা অপছন্দ করেন, পবিত্র কোরআনে এসেছে,
إِنَّ الَّذِينَ كَذَّبُوا بِآيَاتِنَا وَاسْتَكْبَرُوا عَنْهَا لاَ تُفَتَّحُ لَهُمْ أَبْوَابُ السَّمَاءِ وَلَا يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ حَتَّى يَلِجَ الْجَمَلُ فِي سَمِّ الْخِيَاطِ وَكَذَلِكَ نَجْزِي الْمُجْرِمِينَ- (الأعراف 40)-
(ইন্নাল্লাজীনাকায্যাবূ বিআ-য়াতিনা ওয়াস্তাকবারূ ‘আনহা, লা তুফাত্তাহু লাহুম আব্ওয়াবুস-সামাই ওয়ালা ইয়াদখুলূনাল-জান্নাতা হাত্তা ইয়ালিঝাল-জামালু ফী সাম্মিল-খিয়াত। ওয়া কাজালিকা নাজজিল-মুজরিমীন।)
‘নিশ্চয়ই যারা আমাদের আয়াত সমূহে মিথ্যারোপ করে এবং তা থেকে অহংকার বশে মুখ ফিরিয়ে থাকে, তাদের জন্য আকাশের দুয়ার সমূহ উন্মুক্ত করা হবে না এবং তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যতক্ষণ না ছুঁচের ছিদ্রপথে উষ্ট্র প্রবেশ করে। এভাবেই আমরা পাপীদের বদলা দিয়ে থাকি’ (সূরা আল আ‘রাফ, আয়াত ৪০)
আয়াতে সুস্পষ্ট প্রতিয়মান, কেউ ইচ্ছাকৃত, বা অহংকার বশত যদি ইসলাম ও আয়াত সমূহ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাইলে তার জান্নাতে প্রবেশ করা ঠিক ততটাই অসম্ভব, যতটা অসম্ভব একটা ছুঁচোর ছিদ্রপথে উঠকে প্রবেশ করানো।
যারা কুফরি করে, বা না জেনে বিরোধীতা করে, তাদের উদ্দেশ্য এ আয়াত নয়। বরংচ যারা ইচ্ছাকৃত, অহংকারবশত অস্বীকার করে, তাদের জন্য এ আয়াত। এবং এ অহংকারীদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা।

অহংকার নিয়ে হাদিস
আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এরশাদ করেছেন, لاَ يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ كَانَ فِى قَلْبِهِ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ مِنْ كِبْرٍ. قَالَ رَجُلٌ إِنَّ الرَّجُلَ يُحِبُّ أَنْ يَكُونَ ثَوْبُهُ حَسَنًا وَنَعْلُهُ حَسَنَةً. قَالَ : إِنَّ اللهَ جَمِيلٌ يُحِبُّ الْجَمَالَ الْكِبْرُ بَطَرُ الْحَقِّ وَغَمْطُ النَّاسِ- ‘ঐ ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না যার অন্তরে কণা পরিমাণ অহংকার রয়েছে। জনৈক ব্যক্তি প্রশ্ন করল, লোকেরা চায় যে, তার পোষাক সুন্দর হোক, তার জুতা জোড়া সুন্দর হোক। জবাবে তিনি বললেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ সুন্দর। তিনি সৌন্দর্য পছন্দ করেন। ‘অহংকার’ হ’ল ‘সত্যকে দম্ভের সাথে পরিত্যাগ করা এবং মানুষকে তুচ্ছ জ্ঞান করা’। (মুসলিম হাঃ নঃ- ৯১)
অর্থাৎ যার মনে বিন্দুমাত্র অহংকার থাকে, তার জন্য জান্নাত হারাম হয়ে যায়। যে নিজেকে অন্যের চাইতে বড় ভাবে, দম্ভের সাথে চলাফেরা করে। আচার আচরণে দাম্ভিকতা প্রকাশ পায়, তাদের জন্য রয়েছে কঠিন দুঃসংবাদ।
এরা সত্য জেনেও মিথ্যার উপর দৃঢ় থাকে। মিথ্যাকে আঁকড়ে ধরে। নানারূপ অজুহাত প্রদর্শন করে সত্য থেকে বিমুখ হয়।
অহংকারি মানুষ যখন অন্যের নিকট যথাযথ মূল্যায়ন পেতে ব্যর্থ হয়, তখনই সে অন্যকে হেয় জ্ঞান করে। যা অহংকারেরই প্রতিরূপ।
অহংকার পতনের মূল:
ইসলামি ইতিহাসে অহংকার ছিলো সর্বপ্রথম গুনাহ। সর্বপ্রথম মানব হযরত আদম (আঃ) এর সৃষ্টির পর মহান আল্লাহ যখন তাকে সেজদাহ করতে বলেছিলেন, তখন শয়তান অহংকারবশত এর বিরোধিতা করেছিলো। এবং পরবর্তীতে সে নিক্ষেপ হয়েছিলো ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে। তার জন্য মহান আল্লাহ তৈরি করে রেখেছেন চিরস্থায়ী শাস্তির বন্দোবস্ত।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ এ বিষয়ে বলেন,
“সে অস্বীকৃতি জানাল এবং অহংকার করল। আর সে ছিল কাফেরদের অন্তর্ভুক্ত।” (সুরা বাকারা: ৩৪)
অহংকারি ব্যাক্তি কখনোই জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবেনা।
মহান আল্লাহ বলেন, “যারা আল্লাহর প্রতি মিথ্যারোপ করে কেয়ামতের দিন তুমি তাদের মুখগুলো কালো দেখতে পাবে. অহংকারীদের আবাসস্থল কি জাহান্নামে নয়?” (সুরা যুমার: ৬০)
“তাদেরকে ‘বলা হবে- জাহান্নামের দরজা দিয়ে প্রবেশ করো, তোমাদেরকে চিরকাল এখানে থাকতে হবে। অহংকারীদের আবাসস্থল কতই না নিকৃষ্ট!” (সুরা যুমার: ৭২)

অহংকার নিয়ে উক্তি:
হাদিস শরীফে এসেছে, “হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেন, আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘ইজ্জত-সম্মান হচ্ছে আমারই পোশাক এবং গর্ব-অহংকার হচ্ছে আমারই চাদর। তাই যে ব্যক্তি এ দুয়ের কোনোটি নিয়ে টানাটানি করবে, তাকে আমি কঠোর শাস্তি দেবো। (মুসলিম: ২৬২০; আবু দাউদ: ৪০৯০, ইবনু মাজাহ: ৪১৭৪)
অর্থাৎ অহংকারের চাদর নিয়ে আমরা যেরূপ টানাটানি করি, তা আমাদের জন্য ক্ষতি বয়ে আনছে। যা মহান আল্লাহর মর্যাদা, তা আমাদের জন্য নয়। অহংকার, ইজ্জত, গর্ব, সব কিছুই কেবল একজনেরই প্রাপ্য।
টাকার অহংকার নিয়ে উক্তি:
দাম্ভিকতা প্রদর্শনের অন্যতম একটি মাধ্যম হলো টাকা। দাম্ভিক ব্যক্তি নিজের অর্থ নিয়ে অহংকারী হয়ে উঠে, এবং সমাজের নিচু স্তরের মানুষকে এরুপ ভাবে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে, যেন তারা তার টাকায় কেনা গোলাম।
তবে টাকা অহংকারের বহিঃপ্রকাশ হলেও, এটি দাম্ভিক ব্যাক্তিটির অসুবিধার কারণ হয়ে দাঁড়ায় অনেকসময়।
এডওয়ার্ড ডায়ারের ভাষায়,: “স্বাস্থ্য এবং টাকা নিয়ে কখনো অহংকার করা উচিত নয়, কারণ যেকোনো সময়েই এই দুটি সম্পদ নষ্ট হয়ে যেতে পারে।”
হিংসা ও অহংকার নিয়ে উক্তি:
অন্যের ভালো সহ্য করতে না পারা, কিংবা অন্যের সফলতায় চক্ষুশূল হওয়াই হলো হিংসা।
হিংসায় জর্জরিত হওয়া, অহংকারের মতোই নিন্দনীয় কাজ।
“হিংসা নিজের আত্মাকে ছোট করে এবং অন্যের ক্ষতি করার প্রবণতা বাড়ায়।” — রেদোয়ান মাসুদ”
রুপের অহংকার নিয়ে উক্তি:
অহংকার শুধু টাকার মধ্যেও সীমাবদ্ধ কথা নয়। রূপ, সৌন্দর্য, কোমলতাও এখন অহংকারের বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
অতিরিক্ত কালো ব্যাক্তি দের তারা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে। অবমূল্যায়ন করে। অনেক সময় এই অহংকারী ব্যাক্তিদের জন্য তাদের গায়ের রং, তাদের মুখয়ব, সবকিছুই লজ্জার কারণ হয়ে দায়।
নিজের সাদা চামড়াকে তারা অস্বাভাবিক রকম ভালোবাসে, কিন্তু অপর এক রক্ত মাংসের মানুষকে তারা প্রাণ খুলে দূরে ঠেলে দেয়। কটু কথা বলে।
বিপদ কেটে গেলে মানুষ অহংকারী হয়:
বিপদ, ও আনন্দ, উভয়েই মহান আল্লাহর নিদর্শন। একটি না রইলে অন্যটির গুরুত্ব উপলব্ধি হয় না।
পবিত্র কোরআন শরীফে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, “বিপদ কেটে গেলে মানুষ অহংকারী ও উৎফুল্ল হয়ে থাকে।”
অহংকার মানব জাতীর জন্য এক অভিশাপের চেয়ে কম কিছু নয়। বিপদে পড়লে শুধু তারা মাথা নত করবে, বিপদ কেটে গেলেই উৎফুল্ল হয়ে যাএ। মুনাফিকদের লক্ষণ বুঝি একেই বলে!
আমরা অহংকারের মতো ঘৃণিত কাজ বর্জন করবো। ঘৃণা ও হিংসার মতো কাজ আখলাকে জামিয়ার অন্তর্ভুক্ত, যা খারাপ চরিত্রকে নির্দেশ করে। বড়দের সম্মান, ছোটদের প্রতি যথাযথ স্নেহ অহংকারকে দূরে রাখে।
পরিশেষে আপনিই সিদ্ধান্ত নিন। অহংকারি হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হতে চান? না স্নেহের সুবাতাসে আরো কিছু নূরের আলোকে, শক্ত করে জড়িয়ে ধরতে চান?
– মির্জা শাহারিয়া
আরো পড়ুন আমল ও রুহানিয়াত
